
মোড়কবিহীন ভেজাল বিস্কুটের দৌরাত্ম্য: স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থা।
বিস্কুট একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে সকালে ও বিকেলে নাস্তার সময়। এটি সহজলভ্য, সস্তা এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের খাদ্য তালিকায় জনপ্রিয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে মোড়কবিহীন ভেজাল বিস্কুটের দৌরাত্ম্য একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান সমাজে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের মধ্যে বিস্কুটের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। অথচ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও উৎপাদক অধিক মুনাফার আশায় খাদ্য নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে মোড়কবিহীন নিম্নমানের ও ভেজাল বিস্কুট বাজারজাত করছে। এ ধরনের বিস্কুটে প্রয়োজনীয় খাদ্য গুণাগুণ অনুপস্থিত থাকে এবং বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত থাকে, যা মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আমাদের আশেপাশে বাজারে অনেক খুচরা দোকানে, হাট-বাজারে, এমনকি রাস্তার পাশে ভেজাল মিশ্রিত ও নিন্মমানের বিস্কুট উন্মুক্তভাবে বিক্রি হচ্ছে। কোথা থেকে এই বিস্কুট উৎপাদন হচ্ছে ও বাজারে আসছে ? উৎপাদনের পরিবেশ কি স্বাস্থ্যকর ? অনেক বেকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে উৎপাদন করছে এবং বাজারজাত করছে এই খাদ্যদ্রব্য। যেসব বিস্কুট খোলা মোড়কে বিক্রি হয়, সেগুলোর গুণগত মান কিংবা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই। বিস্কুট তৈরি কোথায় হচ্ছে? কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে? এগুলো নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। এসব পণ্যের উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সময় এবং মান নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রমাণ না থাকার ফলে সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এই ভেজাল বিস্কুট উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহৃত হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে চর অঞ্চল ও গ্রামীন এলাকায় বসবাসরত নিম্ন আয়ের জনগণ, যারা পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে সচেতন নয়, তারা এসব ভেজাল বিস্কুট ক্রয় করছে। বাজারে কেজি দরে প্রতি কেজি বিস্কুট ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা অনেক সস্তা। ফলে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষজন, সহজেই এই সস্তা বিস্কুটের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। অথচ, এসব বিস্কুটের মধ্যে যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হচ্ছে, তা জানার মতো তথ্য তাদের কাছে নেই।
নিন্মমানের এই ভেজাল বিস্কুট আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অস্বাস্থ্যকর উপাদান ও রাসায়নিক মিশ্রণের কারণে এসব বিস্কুট খাওয়ার ফলে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমনঃ হজমজনিত সমস্যা, পেটের পীড়া, এলার্জি, লিভার ও কিডনির সমস্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এসব ভেজাল খাদ্য খেলে শরীরে টক্সিন জমতে পারে, যা ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের কারণ হতডুপারে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তাদের শরীর তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
মাঠ পর্যায়ে সঠিক ও নিয়মিত তদারকির অভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগ নিচ্ছে। তারা বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে ভেজাল খাদ্য এই বিস্কুট তৈরি করছে। এই অসাধু ব্যবসায়ীরা উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে ভেজাল মিশিয়ে যাচ্ছে। এভাবে তারা সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। কিন্তু বাজার তদারকির অভাবে এই অসাধু কার্যক্রমগুলো অনেক সময় প্রকাশ্যে আসে না। বাজার তদারকি কার্যক্রম জোরদার করতে না পারলে ভেজাল খাদ্যের এই সমস্যা থেকে আমরা মুক্তি পাব না।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) হলো বাংলাদেশের সরকারী মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্যের মান নির্ধারণ ও তা সঠিকভাবে পালন হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক সময় বাজারে বিএসটিআইয়ের অনুমোদনবিহীন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এমনকি অনুমোদনপ্রাপ্ত পণ্যের ক্ষেত্রেও অনেকে বেশি দাম নিচ্ছে কিংবা ভেজাল মিশিয়ে তা বিক্রি করছে। বি এস টি আই এর অধীনে বেকারি পণ্য বিস্কুট প্যাকেটজাতকরণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়মাবলী রয়েছে। সাধারণত, পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এসব নিয়ম মেনে চলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী গুলো হলো: বিস্কুট এ ব্যবহৃত উপাদানগুলো বিশুদ্ধ এবং স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে।উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উপকরণ এবং তাদের উৎস গুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হতে হবে। লেবেলিং এর ক্ষেত্রে প্রতিটি প্যাকেটে পণ্যের নাম, উপাদান তালিকা, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, ওজন এবং মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। কারখানার নাম, ঠিকানা এবং বিএসটিআই অনুমোদন নম্বর থাকতে হবে। উপাদানে ব্যবহৃত অ্যালার্জেন উপাদানের তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
প্যাকেটের জন্য ব্যবহৃত উপকরণে কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।প্যাকেটটি এমনভাবে সিল করা থাকতে হবে যাতে বাইরের দূষণ বা আর্দ্রতা থেকে পণ্যটি সুরক্ষিত থাকে। প্যাকেটটি রিসাইকেলাবল বা পরিবেশবান্ধব হলে ভালো হয়।বিক্রয়ের জন্য বিএসটিআই অনুমোদন সনদপত্র প্রাপ্তির জন্য আবেদন করতে হয়। অনুমোদন প্রাপ্ত হলে বিএসটিআই লোগো ব্যবহার করা যায়, যা ক্রেতাদের জন্য মানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। উৎপাদনের সময় স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। সমস্ত কর্মচারী স্বাস্থ্য সম্মত পোশাক পরে থাকতে হবে এবং সঠিক হাইজিন মেনে চলতে হবে।
এছাড়া বাজার তদারকি ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন এর অধীনে অপরাধ সংঘটিত হলে আইন অনুযায়ী কর্মকর্তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। তারা ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করতে পারেন, জরিমানা আরোপ করতে পারেন, এমনকি ব্যবসা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু এই আইন প্রয়োগে গাফিলতি এবং পর্যাপ্ত তদারকি না থাকার কারণে বাজারে ভেজাল বিস্কুটের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা দিন দিন কমছে। এই সুযোগে অতি লোভী ব্যবসায়ীরা ভেজাল খাদ্যদ্রব্য সস্তায় বিক্রি করে তাদের মুনাফা বৃদ্ধি করছে। মানুষ সস্তায় পণ্য কিনতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
এই ভেজাল বিস্কুটের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকার, ভোক্তা অধিকার সংস্থা, বিএসটিআই, এবং সাধারণ জনগণ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিএসটিআইকে তার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে, যাতে বাজারে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রি কমানো সম্ভব হয়।এছাড়া, জনগণকে ভেজাল পণ্য সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জনগণ যদি এসব ভেজাল পণ্য কিনতে বিরত থাকে এবং স্বাস্থ্যকর পণ্য কেনার প্রতি মনোযোগ দেয়, তাহলে ভেজাল খাদ্য বাজার থেকে ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিস্কুট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যদ্রব্য হলেও বাজারে মোড়কবিহীন ভেজাল বিস্কুটের সরবরাহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ভেজাল খাদ্য, বিস্কুট আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে । খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ প্রতিরোধে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক ভাবে বাজার তদারকি কার্যক্রম,ভেজাল বিরোধী অভিযান এবং জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: ড. শহীদুজ্জামান,মার্কেটিং বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক,উত্তর বাংলা কলেজ, কাকিনা-লালমনিরহাট।ইমেইল:shahiduzzaman.mkt@gmail.com