সবার কথা বলে

সংসারে পণ্ডিত মহিলারা দোজখের আখড়া নয়, বরং বেহেশতের শান্তির প্রতীক

0 27

সংসারে পণ্ডিত মহিলারা দোজখের আখড়া নয়, বরং বেহেশতের শান্তির প্রতীক।

মোঃ ইব্রাহিম হোসেন – রাজশাহী

অনেকেই বলে,
“যে ঘরে মহিলা পণ্ডিত থাকে
সে ঘর দোজখের আখড়া”

আমি উত্তরে বলি,
কথাটা নির্ভেজাল ১০০% ভাগ সত্য, সঠিক কি না তা আমার বোধগম্য নয়। হলেও হতে পারে।
কারণ, সব পরিবার, সব মহিলা একরকম না।

তবে আমার মতে কথাটি ১০০% সঠিক নয়।
একজন খারাপ নারীর সকল নারীকে এভাবে “দোজখের আখড়া” আখ্যা দেওয়া অনুচিত ও অনৈতিক বলেই মনে করি।

সবার আগে আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, নারীই আমাদের মা, যাঁর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশতে নিহিত।

নারীই আমাদের বোন, নারীই আমাদের সহধর্মিণী। আবার এই নারীই আমাদের কলিজার টুকরা, নয়নমণি, সাত রাজার ধন।
নারীর মর্যাদা দিতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি বলেছেন,
যার ঘরে একটা মেয়ে, সে জান্নাতি,
যার ঘরে দু’টি মেয়ে সেও জান্নাতি,
আর যার ঘরে তিনটি মেয়ে সে আমি নবী “সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” এর সাথে জান্নাতি।
তবে শর্ত মেয়েদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সুপাত্র দান করতে হবে।

মূ আলোচনায় আসি, এমনও পরিবার আছে, যে পরিবারের পুরুষ কর্তা আধ-পাগলা, বোধহীন, অতিরিক্ত সহজ-সরল, সংসার সম্পর্ক তার জ্ঞান, ভালোমন্দ কোনো ধ্যান ধারণাই থাকে না। স্ত্রীকেই সংসারের ঘানি টানতে হয়। ছেলেমেয়ে, নিজের ও নিজের স্বামীর সব কিছুই চিন্তাভাবনা করে চলতে হয়।

এমনও স্বামী আছে, একদিন আয় করে দু’দিন বসে থাকে থাকে, দুদিন আয় করে তিনদিন বসে থাকে। এই একদিন দুই দিনের আয় দিয়েই স্ত্রীকে দুইদিন, তিনদিন সংসার চালাতে হয়। এভাবেই চিন্তা করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সংসার চালাতে হয়।

অথবা উক্ত সহজ-সরল স্বামীর আয় যথেষ্ট পরিমাণ নয়, যা আয় করে তা দিয়ে সংসার চলে না কিংবা সংসারে বাবা নাই, আছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। এমতাবস্থায় সংসার চালানোর জন্য, ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, তাদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য কোনো না কোনো কর্ম বা চাকরিতে নিজেকেও নিয়োজিত করতে হয় ঐ মহিলা নামক পণ্ডিত স্ত্রীকেই।

এমনও স্বামী আছে, যে প্রবাসী, প্রবাসে থাকে। বছরের পর বছর সংসারের সুখের জন্য পিতামাতা, ভাইবোন, স্ত্রী সন্তানের শ্রদ্ধা, স্নেহ,মায়া-মমতা, ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে বিদেশেই থাকতে হয়।
সে পরিবারে থাকে বাবা ও মা বৃদ্ধ। থাকে ছোট ছোট ভাইবোন, দেবর, ননদ ও সন্তানসন্ততি।
সে পরিবারের হাল কে ধরবে?

পুরুষ কর্তা তো বাইরে।
সে পরিবারের হাল তো ঐ মহিলা নামক পণ্ডিত স্ত্রীকেই ধরতে হবে। আর সে যদি পণ্ডিত সেজে সংসারের হাল না ধরে, তবে সে সংসার তছনছ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে একটা সহজ-সরল স্বামীর বা ঐ প্রবাসী স্বামীর সুন্দর একটা সাজানো গোছানো সুখের সংসার। ধ্বংস হয়ে যাবে মনের গহীনে সাজানো লালিত-পালিত স্বপ্ন সাধনার রঙিন ভুবন।

আবার এমনও পরিবার আছে, যে পরিবারে ছোট ছোট বাচ্চা রেখে কর্তা পুরুষ বাবাটা চিরবিদায় নিয়ে পরলোক গমন করেছেন।
সেই পরিবারের হাল কে ধরবে?
সেই পরিবারের হাল তো ঐ মহিলা নামক পণ্ডিত স্ত্রীকেই ধরতে হবে। তার ভাঙা তরীর হাল ধরে তো কেউ কিনারায় পৌঁছে দেবে না। তাকেই কিনারায় নিতে হবে।

হয়তো বলতে পারেন যে, সেই পরিবারে কি কোনো পুরুষ নাই?
উত্তরে বলি, হ্যাঁ, থাকতেও পারে।
তবে এমনও পরিবার থাকে, যে পরিবারে ঐ সহজ-সরল স্বামী ছাড়া আর কোনো পুরুষ থাকে না। সে সংসারের হালও ঐ মহিলা নামক পণ্ডিত স্ত্রীকেই ধরতে হয়।

আর যদিও থাকে, তবে ক’দিন তারা মিলেমিশে থাকে? নিজের স্বার্থে সবাই বৌ নিয়ে দিকেদিকে আলাদা হয়ে যায়,কেউ কারো খোঁজ খবর রাখে না। নিজের সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সদাসর্বদা ব্যস্ত থাকে নিজেকে সর্বচূড়ায় আরোহন করার প্রচেষ্টায়। ভাই ভাইয়ের খোঁজ রাখে না, বোন বোনের খোঁজ রাখে না। এভাবেই চলছে পৃথিবীর কর্মলীলা। এমনও কুলাঙ্গার সন্তান আছে, তারা নিজের ভাইবোন তো দূরের কথা, জন্মদাতা, জন্মদাত্রী বাবা-মা’রও খোঁজ খবর রাখে না।

তাছাড়া বিশেষ করে ল বিয়ের পর সবারই সংসারের সব দায়-দায়িত্ব কিন্তু স্বামী স্ত্রীর উপরেই অর্পিত হয়। তাদেরকেই আঁধারে আলো জ্বালাতে হয়। তখন বাবা-মা হয়ে যায় অচল।
তাদেরকে লাঠি ধরে চলাচল করতে হয়। ছেলের অনুপস্থিতিতে বৃদ্ধ বাবাও সংসারের হাল ধরতে পারে না। তখনও সংসারের হাল ধরতে হয় ঐ মহিলা নামক পণ্ডিত স্ত্রীকেই।

সূতরাং- এমন সব পুরুষের সংসারকে গচ্ছিত রাখার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অশেষ রহমত ও দয়ায় তাদের মতো পুরষের ভাগ্যে এমন রূপবতী, গুণবতী, পুণ্যবতী, নারী বৌ হিসেবে উপহার দিয়ে থাকেন, আর সে নারীরাই অর্থাৎ সে-ই পণ্ডিত নামের মহিলারাই সংসারের হাল ধরে কত ঝড়-ঝাপটা, জ্বালা-যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্টের সীমা পেরিয়ে সংসারকে একটা ছোট্ট সুখের আবাসস্থলে পরিণত করেন।

এমন পরিবারের জন্য এমন পণ্ডিত মহিলাই সকল সুখের মূল। এমন পরিবারের কর্তা বা পুরুষের জন্য এমন একজন গুণবতী, পূণ্যবতী মহিলা পণ্ডিতই আশীর্বাদস্বরূপ।

এমন পণ্ডিত মহিলারা কখনোই সংসারে দোজখের আখড়া নয়, বরং বেহেশতের শান্তির প্রতীক।
আমি এঁদেরকে সেলুট জানাই এবং মহান আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করি।

মোট কথাঃ তিক দেবার সবাই থাকে,
কিন্তু ভিখ দেবার কেউ থাকে না।
এটাই হলো আমাদের সমাজের প্রচলিত রূপ।
দশদিন না খেয়ে থাকলে কেউ খোঁজ নেবে না।
কিন্তু একদিন চুরি করলে তাকে নিয়ে সমাজে বিশাল সালিশ বসে!

কেউ তদন্ত করে না যে, চুরিটা কী জন্য করলো?
আসুন, সকলে মিলে এমন মনের ভ্রান্ত ধারণা দূর করি এবং মানুষ হিসেবে মানুষকে সম্মান করতে শিখি। মানুষের মনের দুঃখ, কষ্টগুলোকে বুঝার চেষ্টা করি। তাদের দিকে মানবতার হাত বাড়াই।
তিক নয়, সমর্থ থাকলে ভিখ দিই।

তাঁদের কষ্টগুলো ভাগাভাগি করে প্রত্যেককেই প্রত্যেক সৎ কাজের জন্য অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনা দিই, তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করি।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.