
ফিরে দেখা ৫ আগস্ট: ঘণ্টায় ঘণ্টায় রক্তাক্ত যাত্রাবাড়ী।
মাসুদ মাহাতাব, ঢাকা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো দিন। সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার আগেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, কাজলা, ধলপুর ও সায়েদাবাদ এলাকা পরিণত হয়েছিল উত্তপ্ত সংঘর্ষের কেন্দ্রে। দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিটি ঘণ্টা যেন লিখেছে রক্তাক্ত এক ইতিহাস।
সকাল ৮:০০টা – ৯:০০টা
ভোর থেকেই যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, শনির আখড়া ও ধলপুর এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল এসে মিলিত হয় যাত্রাবাড়ী মোড়ে। দোকানপাট বন্ধ হতে থাকে, যান চলাচল প্রায় থেমে যায় এবং পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল ৯:০০টা – ১১:০০টা
মিছিলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও পরিস্থিতি তখনও পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষে রূপ নেয়নি। আশপাশের বাসিন্দারা নিরাপত্তার জন্য ঘরের ভেতরে অবস্থান নিতে শুরু করেন।
দুপুর ১১:০০টা – ১:০০টা
যাত্রাবাড়ী, কাজলা ও সায়েদাবাদ এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমার ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পুরো এলাকাজুড়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুর ১:০০টা – ২:৩০টা
যাত্রাবাড়ী থানার সামনে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়ে। সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। আহত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেকেই আশপাশের হাসপাতালের দিকে ছুটে যান।
দুপুর ২:৪৩ মিনিট
বিবিসি আই-এর ডিজিটাল অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই সময় থেকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ভিডিওর মেটাডেটা, ড্রোন ফুটেজ এবং শতাধিক ছবি বিশ্লেষণ করে এই সময়টি নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী প্রায় ৩০ মিনিট টানা গুলিবর্ষণ চলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ([Dhaka Tribune]
বিকেল ৩:০০টা – ৪:০০টা
পুরো যাত্রাবাড়ী এলাকা রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়। সড়কে একের পর এক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আহতদের অনেকেই দীর্ঘ সময় উদ্ধার না পেয়ে রাস্তায় ছটফট করছিলেন। ভ্যান, রিকশা ও মোটরসাইকেলে করে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলতে থাকে। বিবিসির ড্রোন ফুটেজে মহাসড়কে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ([Dhaka Tribune]
বিকেল ৪:০০টা – ৫:০০টা
সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রাবাড়ী থানার আশপাশে সহিংসতা চরমে পৌঁছায়। ব্যারিকেড, পোড়া যানবাহন, ইট-পাথর ও গুলির খোসায় পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র ধারণ করে।
সন্ধ্যা ৫:০০টার পর
সরকার পতনের খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও যাত্রাবাড়ীতে আতঙ্ক কাটেনি। বহু পরিবার তখনও নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছিল। আহতদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলোতে সৃষ্টি হয় তীব্র চাপ।
ঘটনা:
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী ছিল দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষস্থলগুলোর একটি। প্রাথমিকভাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০ বলে জানা গেলেও, পরবর্তীতে বিবিসি আই-এর অনুসন্ধানে ভিডিও, ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অন্তত ৫২ জন নিহতের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ একক দিনের পুলিশি সহিংসতার অন্যতম ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ([The Business Standard]
আজও ৫ আগস্ট ফিরে এলে যাত্রাবাড়ীর রাজপথ যেন সেই দিনের নীরব সাক্ষ্য বহন করে। রক্তে ভেজা সড়ক, স্বজন হারানোর কান্না এবং আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে থাকা একটি জনপদের স্মৃতি ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে।