0 21

অচেনা কারিগর
📝লিজেন হোসেন
শহরটা প্রতিদিন একই নিয়মে জাগে। যান্ত্রিক কোলাহল, রিকশার টুংটাং আর ঊছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে। এই ভিড়ের মাঝে দশম শ্রেণীর ছাত্র আরিয়ানও একজন। কাঁধে ভারী স্কুল ব্যাগ, কানে হেডফোন না থাকলেও মনের ভেতর একরাশ চিন্তার ভাঁজ। আরিয়ানের স্কুলের পথটা খুব একটা মসৃণ নয়, তবে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে তারপা দুটো প্রতিদিন থমকে যায়।
শহরের ব্যস্ত মোড়ের এক কোণে, একটা পুরনো অশ্বত্থ গাছের নিচে বসে থাকেন এক বৃদ্ধ। জীর্ণ পোশাক, উস্কোখুস্কো চুল আর একটা পা অদ্ভুতভাবে ভাঁজ করা। সামনে একটা প্লাস্টিকের বাটি। লোকটা কখনো চিৎকার করে ভিক্ষা চায় না। শুধু করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে পথচারীদের দিকে।
আরিয়ানের একটা অদ্ভুত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন টিফিনের টাকা থেকে বাঁচানো কিছু অংশ সে ওই বৃদ্ধের বাটিতে রাখে। কোনোদিন পাঁচ টাকা, কোনোদিন দশ টাকা। যেদিন পকেটে কিছুই থাকে না, সেদিন সে কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে মাথা নিচু করে চলে যায়।
সেদিন ছিল বৃষ্টির সকাল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। আরিয়ান ছাতা মাথায় দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। গাছের নিচে বৃদ্ধকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। বৃদ্ধ শীতে কাঁপছেন। আরিয়ান পকেট হাতড়ে বিশ টাকার একটা নোট বের করে বাটিতে রাখল।
বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকালেন। ঝাপসা চোখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, “বেঁচে থাকো বাবা। তোমার মত কেউ প্রতিদিন ফিরে তাকায় না।”
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল, “দাদা, কাল শরীরটা ভালো ছিল না আপনার? আজ কেন এসেছেন এই বৃষ্টিতে?”
বৃদ্ধ এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “পেটের টান বড় টান রে দাদুভাই। না এলে যে উনুন জ্বলবে না।”
এই ‘দাদুভাই’ ডাকটা আরিয়ানের মনে গেঁথে গেল। তার নিজের দাদা নেই, ছোটবেলায় হারিয়েছেন। এই অচেনা ভিক্ষুকের কণ্ঠে দাদু ডাকটা তার কাছে খুব আপন মনে হলো। সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্কের এক নতুন নাম হলো। আরিয়ান তাকে ‘দাদা’ বলে ডাকতে শুরু করল।
স্কুলে যাওয়ার সময় আরিয়ান এখন আর শুধু টাকা দেয় না, মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে বিস্কুট বা একটা আপেল নিয়ে আসে। রাস্তার ধারের সেই ধুলোবালি মাখা মানুষটা আরিয়ানের কাছে তখন আর স্রেফ একজন ভিক্ষুক থাকেন না, হয়ে ওঠেন এক পরমাত্মীয়। আরিয়ান তাকে নিজের স্কুলের গল্প শোনায়, ক্লাসের পড়া না পারার ভয়ের কথা বলে। বৃদ্ধ শুধু শোনেন আর মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
একদিন আরিয়ান জিজ্ঞেস করল, “দাদা, আপনার কি কেউ নেই? এই বয়সে কেন এখানে বসে থাকেন?”
বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বললেন, “সব ছিল দাদুভাই। ঘর ছিল, ঘরণী ছিল, দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এক ঝড়ে সব ওলটপালট হয়ে গেল। এখন আমি এই শহরের এক টুকরো অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা।”
আরিয়ান সেদিন বুঝতে পারেনি সেই ‘ঝড়’টা কী ছিল। সে ভেবেছিল হয়তো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সে জানত না, এই মানুষটির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক আগ্নেয়গিরি, যা কয়েক দশক ধরে নিভৃতে জ্বলছে।
দিনগুলো এভাবেই কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন ছন্দপতন ঘটল। আরিয়ান যথারীতি স্কুলের পথে সেই গাছের তলায় এল, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। জায়গাটা শূন্য। বাটিটা পড়ে আছে উল্টে। আরিয়ানের বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। বৃদ্ধ কি অসুস্থ? নাকি অন্য কোথাও চলে গেলেন?
পরদিনও দেখা নেই। তার পরের দিনও না। আরিয়ানের পড়াশোনায় মন বসছে না। তার মনে হচ্ছে, পরিবারের কেউ একজন নিখোঁজ হয়ে গেছে। সে ঠিক করল, আজ সে স্কুলে যাবে না। খুঁজে বের করবে তার সেই দাদাকে।
শহরের বস্তি এলাকাগুলোর দিকে খোঁজ নিতে শুরু করল আরিয়ান। ছোট এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করতেই সে ইশারায় একটা ভাঙাচোরা ঝুপড়ি দেখিয়ে দিল। নর্দমার পাশে প্লাস্টিক আর চট দিয়ে ঘেরা এক কুঠুরি। আরিয়ান ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। ভেতর থেকে এক গোঙানির শব্দ আসছে।
সে পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে বৃদ্ধ শুয়ে আছেন। গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়ার মতো জ্বর। আরিয়ানকে দেখেই বৃদ্ধের ঘোলাটে চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “দাদুভাই… তুমি এসেছ?”
ঝুপড়ি ঘরের ভেতরটা গুমোট। স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ আর তপ্ত নিশ্বাসের উত্তাপে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আরিয়ান এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি, যাকে সে প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে দেখে, তার জীবনটা এতখানি জীর্ণ হতে পারে। প্লাস্টিকের চাল ভেদ করে চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি এক কোণে জমা হয়ে আছে।
আরিয়ান বৃদ্ধের কপালে হাত রাখল। আগুনের মতো পুড়ছে শরীর। সে আঁতকে উঠে বলল, “দাদা, আপনার তো ভীষণ জ্বর! আপনি কাউকে খবর দেননি কেন? এভাবে একা পড়ে আছেন?”
বৃদ্ধ কষ্টে একবার চোখ মেললেন। তার ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “খবর কাকে দেব দাদুভাই? এই শহরে আমার খবর নেওয়ার মতো কেউ বেঁচে নেই। ভেবেছিলাম এভাবেই শেষ হয়ে যাব, কিন্তু ঈশ্বর বোধ হয় তোমাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ করে দিলেন।”
আরিয়ান আর দেরি করল না। ব্যাগ থেকে নিজের পানির বোতল বের করে বৃদ্ধকে অল্প অল্প করে পানি খাওয়াল। তারপর বলল, “আমি এখনই ডাক্তার নিয়ে আসছি, অথবা আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন।”
বৃদ্ধ আরিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। জীর্ণহাত হলেও তাতে যেন এক অদ্ভুত জেদ মিশে আছে। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “না দাদুভাই, ডাক্তার বা হাসপাতাল—কিছুতেই আর কাজ হবে না। প্রদীপ শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার একটা দায় আছে। একটা ঋণ শোধ করার আছে।”
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল। এই নিঃস্ব মানুষটার কিসের ঋণ? বৃদ্ধ অতি কষ্টে বালিশের নিচ থেকে একটা পুরনো, চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি বের করলেন। ডায়েরিটা ধুলোবালি আর বয়সের ভারে বিবর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু খুব যত্ন করে একটা পলিথিনে মোড়ানো ছিল।
বৃদ্ধ কম্পিত হাতে ডায়েরিটা আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, “আজ অনেকদিন পর পকেটে কিছু পয়সা নিয়ে এসেছিলে আমাকে দেওয়ার জন্য, তাই না? কিন্তু আজ আমি তোমার কাছে এমনি এমনি কিছু নেব না। এই ডায়েরিটা নাও। এটা আমার জীবনের একমাত্র দলিল। এর বিনিময়ে আমাকে শুধু কয়েকটা ওষুধ এনে দাও, যাতে শেষ কয়েকটা ঘণ্টা আমি একটু শান্তিতে শ্বাস নিতে পারি।”
আরিয়ান হতভম্ব হয়ে ডায়েরিটা হাতে নিল। সে বুঝতে পারছিল না একজন ভিক্ষুকের ডায়েরিতে এমন কী থাকতে পারে। সে ডায়েরিটা ব্যাগে পুরে দ্রুত পাশের ফার্মেসিতে দৌড়ে গেল। কিছু জ্বরের ওষুধ আর পথ্য নিয়ে ফিরে এসে বৃদ্ধকে খাইয়ে দিল। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ পর কিছুটা শান্ত হলেন, তার চোখ দুটো বুজে এল তন্দ্রায়।
সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভার হয়ে রইল। বাসায় ফিরে সে পড়ার টেবিলে বসল ঠিকই, কিন্তু বইয়ের পাতায় মন বসল না। তার বারবার মনে পড়ছিল সেই জীর্ণ কুটির আর বৃদ্ধের করুণ চোখের আকুতি। ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করল সে।
ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলতেই তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সেখানে অত্যন্ত সুনিপুণ হাতে লেখা:
”আমি হয়তো আজ নেই, কিন্তু এই মাটি জানে আমি কী দিয়েছিলাম। ১৯৭১ সালে যখন দেশটা জ্বলছিল, তখন আমি ভিক্ষুক ছিলাম না—আমি ছিলাম এক অপরাজেয় যোদ্ধা।”
আরিয়ানের চোখের সামনে যেন এক নতুন পৃথিবী খুলে গেল। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তে শুরু করল।
ফ্ল্যাশব্যাগ: মে, ১৯৭১
ততদিনে চারদিকে হাহাকার পড়ে গেছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানি বাহিনী। ডায়েরির পাতায় সেই সময়ের বর্ণনা অত্যন্ত জীবন্ত। সেই বৃদ্ধের নাম তখন ছিল ‘আহমেদ’। আহমেদ ছিলেন এক টগবগে যুবক, যার ঘরে ছিল সুন্দরী স্ত্রী জমিলা আর দুই বছরের এক ফুটফুটে সন্তান। আহমেদ কৃষিকাজ করতেন, কিন্তু মনে ছিল দেশপ্রেমের আগুন।
এক রাতে খবর এল পাশের গ্রামে মিলিটারিরা ঢুকেছে। আহমেদ তার স্ত্রীকে বললেন, “জমিলা, তুমি ছেলেকে নিয়ে খালার বাড়ি চলে যাও। আমি যুদ্ধে যাব। দেশ স্বাধীন না করে ফিরব না।”
জমিলা কেঁদেছিলেন, কিন্তু বাধা দেননি। ডায়েরিতে লেখা ছিল— “জমিলার সেই চোখের জল আজও আমার বুকে বিঁধে আছে। আমি জানতাম না, সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা।” আহমেদ যোগ দিলেন স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। তার অদম্য সাহস আর কৌশলের কারণে তিনি দ্রুত সবার প্রিয় হয়ে উঠলেন। কিন্তু যুদ্ধের বিভীষিকা তাকে বড় নির্মম এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাল। আগস্ট মাসের এক কালবেলা। আহমেদ খবর পেলেন তার গ্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে। সে পাগলের মতো ছুটে গেল নিজের ভিটের দিকে। গিয়ে দেখল শুধু ছাই আর ধোঁয়া। তার স্ত্রী আর সন্তানের কোনো চিহ্ন নেই। প্রতিবেশীদের কাছে শুনল, তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ক্যাম্পে।
আহমেদ তখন মানুষ থেকে এক হিংস্র বাঘে পরিণত হলেন। তার ডায়েরিতে সেই রাতের বর্ণনা ছিল শিউরে ওঠার মতো। তিনি একাই সেই রাতে তিনজন শত্রু সেনাকে খতম করেছিলেন, কিন্তু তার নিজের ভাগ্য ছিল সুতোর ওপর ঝুলন্ত। একটি অপারেশনে যাওয়ার সময় গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে তার বাম পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। চিকিৎসার অভাবে সেখানে পচন ধরে, কিন্তু যুদ্ধ তিনি থামাননি। পঙ্গু পা নিয়েই তিনি বিজয়ের দিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন।
পড়া শেষ না করেই আরিয়ান ডায়েরিটা বন্ধ করল। তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে ভাবতে পারছে না, যে মানুষটি দেশের জন্য নিজের সংসার, নিজের পা—সব হারালেন, আজ তিনি রাস্তার মোড়ে বসে ভিক্ষা করেন? কেন এই দেশ তাকে চিনল না? কেন কেউ তার দায়িত্ব নিল না?
আরিয়ান জানালা দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকাল। কাল সকালেই তাকে যেতে হবে দাদুর কাছে। অনেক প্রশ্ন আছে তার মনে। কিন্তু সে জানত না, কাল সকালটা তার জন্য আরও বড় এক ধাক্কা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
রাতভর আরিয়ানের চোখে ঘুম এল না। ডায়েরির প্রতিটি শব্দ তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল। যে মানুষটিকে সে প্রতিদিন রাস্তার ধারের এক নগণ্য ভিক্ষুক মনে করত, সেই মানুষটিই একাত্তরের রণাঙ্গনে রাইফেলের বাঁট ধরে অশুভ শক্তির মোকাবিলা করেছেন। আরিয়ানের মনে হচ্ছিল, সে কোনো এক অলৌকিক জগতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবছিল, কাল সকালে গিয়ে দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলবে— “দাদা, আপনি ভিক্ষুক নন, আপনি আমাদের গর্ব।”
ভোর হতেই আরিয়ান ব্যাগ গুছিয়ে নিল। মা জিজ্ঞেস করলেন, “এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস বাবা? নাস্তা তো করলি না।”
আরিয়ান শুধু বলল, “মা, একজনের খুব দরকার। আমি আসছি।”
দ্রুত সাইকেল চালিয়ে সে সেই জীর্ণ বস্তির দিকে রওনা হলো। রোদ তখনও পুরোপুরি ফোটেনি, কুয়াশা আর ধোঁয়ায় চারপাশটা কেমন ঝাপসা। আরিয়ানের বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। সে যখন সেই ঝুপড়ির সামনে পৌঁছল, দেখল সেখানে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। পাশের ঝুপড়ির এক মহিলা উদাস ভঙ্গিতে বসে আছেন।
আরিয়ান পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরটা কালকের চেয়েও বেশি ঠান্ডা। বৃদ্ধ শুয়ে আছেন আগের মতোই, কিন্তু আজ আর কোনো গোঙানির শব্দ নেই। চারপাশটা কেমন পাথর হয়ে আছে।
”দাদা? দাদামশাই, ঘুমোচ্ছেন?” আরিয়ান ফিসফিস করে ডাকল।
কোনো উত্তর নেই। আরিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধের হাতটা স্পর্শ করল। হিমশীতল! বরফের মতো ঠান্ডা সেই হাত। আরিয়ানের পৃথিবীটা মুহূর্তের মধ্যে দুলে উঠল। সে পাগলের মতো বৃদ্ধের নাড়ি পরীক্ষা করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেখানে প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই।
বৃদ্ধ মারা গেছেন। গতরাতেই কোনো এক সময় নিঃশব্দে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন এক অন্য জগতে। তাঁর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি মাখা হাসি লেগে আছে, যেন মৃত্যুর কোলে মাথা রেখে তিনি শেষ পর্যন্ত সেই ‘ঝড়’ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
আরিয়ানের দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নামল। সে চিৎকার করে কাঁদতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। সে ভাবছিল, এই মানুষটি কি সারা রাত তার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন? নাকি ডায়েরিটা আরিয়ানের হাতে দেওয়ার পর তাঁর জীবনের শেষ উদ্দেশ্যটি সফল হয়েছে বলেই তিনি বিদায় নিয়েছেন?
বস্তির লোকজন জড়ো হতে শুরু করল। কেউ বলল, “বড্ড জ্বরে ভুগছিল বুড়োটা।” কেউ বলল, “যাক, আপদ বিদায় হয়েছে, মরা নিয়ে এখন পুলিশি ঝামেলায় না পড়লেই হয়।”
আরিয়ান অবাক হয়ে মানুষগুলোর দিকে তাকাল। কেউ জানল না এই জীর্ণ দেহটার ভেতরে একসময় কতটা তেজ ছিল। কেউ জানল না এই মানুষটি এই দেশের মানচিত্র আঁকতে নিজের রক্ত দিয়েছেন। আরিয়ান একা হাতে সব ব্যবস্থা করতে শুরু করল। তার জমানো টাকা এবং মায়ের দেওয়া হাতখরচ দিয়ে সে দাফনের কাপড় আর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনল।
পাড়া-পড়শি আর কয়েকজন শ্রমিকের সাহায্যে বৃদ্ধকে গোসল করানো হলো। তাকে যখন সাদা কাফনে মোড়ানো হলো, আরিয়ানের মনে হলো সে এক রাজপুত্রকে বিদায় দিচ্ছে। স্থানীয় কবরস্থানে এক কোণে তার জন্য ছোট একটা কবরের জায়গা হলো।
দাফন শেষ করে সবাই চলে গেল। বিকেল নামছে। আকাশের কোণে লাল আভা। আরিয়ান হাতে একগুচ্ছ শিউলি ফুল নিয়ে কবরের পাশে একাকী দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে বাজছিল ডায়েরির সেই শেষ কথাগুলো— “আমার পা হারিয়েছি, পরিবার হারিয়েছি, কিন্তু দেশ পেয়েছি। এটাই আমার বড় পাওয়া।”
আরিয়ান কবরের ওপর ফুলগুলো পরম মমতায় বিছিয়ে দিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“দাদা, হয়তো এই ডিজিটাল বাংলাদেশে তোমাকে কেউ চেনে না। কেউ জানল না তোমার নাম কোনো গেজেটে নেই, কোনো মেডেলে তোমার নাম খোদাই করা হয়নি। সরকারি তালিকায় তুমি হয়তো শুধু একজন ‘অজ্ঞাতনামা ভিক্ষুক’। কিন্তু আমি তো জানি! আমি জানি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পেছনে যে ভিত তৈরি হয়েছিল, সেই ভিতের একজন কারিগর আপনিও। আপনার রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই আজ আমরা প্রযুক্তির শিখরে ওঠার স্বপ্ন দেখি।”
আরিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে যেন সে শুনতে পাচ্ছিল রাইফেলের গর্জন আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। সে মনে মনে শপথ নিল, এই ডায়েরির কথা সে বিশ্বকে জানাবে। এই নিভৃতচারী যোদ্ধাকে সে হারতে দেবে না।
আরিয়ান যখন কবরস্থান থেকে বের হয়ে আসছিল, তার কাঁধের ব্যাগটা অনেক বেশি ভারী মনে হচ্ছিল। কারণ সেই ব্যাগে এখন কেবল একটি ডায়েরি নেই, আছে একটি জাতির ঋণের বোঝা, যা তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে অনেক দূর।
কয়েকদিন পর
বৃদ্ধ আহমেদের দাফনের পর আরিয়ানের স্বাভাবিক জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। স্কুলের ক্লাসে বসে সে যখন জানালার বাইরে তাকায়, তার মনে হয় অশ্বত্থ গাছের নিচে সেই শূন্য জায়গাটা তাকে চিৎকার করে ডাকছে। ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে সে প্রতিদিন পড়ে। ডায়েরির শেষ পাতায় আহমেদ লিখেছিলেন, “মরার আগে অন্তত একবার যদি নিজের পরিচয়টা ফিরে পেতাম!”
এই বাক্যটি আরিয়ানকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। সে ঠিক করে, সে বসে থাকবে না। শুরু হয় এক অসম লড়াই। দশম শ্রেণীর একজন ছাত্র হিসেবে সরকারি অফিসের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বোঝা তার জন্য ছিল পাহাড়সম বাধা। সে প্রথমে যায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে। সেখানে তাকে ঢুকতেই দেওয়া হয় না। দারোয়ান থেকে শুরু করে কেরানি—সবাই তাকে তাচ্ছিল্য করে।
একদিন সে তার প্রিয় শিক্ষক সালাম স্যারের কাছে যায়। সালাম স্যার আরিয়ানের জেদ দেখে অবাক হন। তিনি বলেন, “আরিয়ান, এই লড়াইয়ে তোমার পড়াশোনা নষ্ট হতে পারে, লোকে তোমাকে পাগল বলবে। তুমি কি তৈরি?” আরিয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “স্যার, দাদা দেশ স্বাধীন করেছিলেন আর আমি তাঁর সম্মানটুকু ফেরাতে পারব না?” সালাম স্যার মুগ্ধ হয়ে আরিয়ানের পাশে দাঁড়ানোর শপথ নেন। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক তথ্যের অনুসন্ধান।
আহমেদের ডায়েরিতে তাঁর গ্রামের নাম ছিল ‘সোনারপুর’। সালাম স্যার আর আরিয়ান মিলে সেই গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রামটি এখন অনেক বদলে গেছে। সেখানে গিয়ে তারা এক প্রবীণ বৃদ্ধের দেখা পায়, যার নাম কাসেম আলী। কাসেম আলী একসময় আহমেদের সাথে একই মোর্চায় যুদ্ধ করেছিলেন।
আরিয়ান যখন কাসেম আলীকে ডায়েরিটা দেখায়, বৃদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি স্মৃতিচারণ করেন কীভাবে আহমেদ একাই একটি পাকিস্তানি ক্যাম্প উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই যুদ্ধে নিজের পা হারিয়েছিলেন। কাসেম আলীর সাক্ষ্য এবং ডায়েরির ভেতরের হাতে আঁকা মানচিত্রগুলো হয়ে ওঠে অকাট্য প্রমাণ। আরিয়ান বুঝতে পারে, এই মানুষটি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় কমান্ডো। কিন্তু যুদ্ধের পর সব হারিয়ে তিনি এই শহরে এসে ভিড় করেন এবং অভিমানে নিজের পরিচয় গোপন রাখেন। আরিয়ান সেই গ্রামের মাটি স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করে, সে এই মাটির ঋণ শোধ করবেই।
গ্রাম থেকে ফেরার পর আরিয়ান আর সালাম স্যার মন্ত্রণালয়ের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। মাসের পর মাস পার হয়ে যায়। আরিয়ানের বাবা-মা শুরুতে খুব রেগে যেতেন। তাঁর বাবা বলতেন, “সামনে পরীক্ষা, আর তুমি এক মরা মানুষের পেছনে সময় নষ্ট করছ?” আরিয়ান বলত, “বাবা, দেশটা যদি না থাকত, তবে আজ আমার পড়ার টেবিলও থাকত না।”
ধীরে ধীরে আরিয়ানের জেদ মিডিয়ার নজরে আসে। সালাম স্যারের এক সাংবাদিক বন্ধু আরিয়ানের এই লড়াই নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপেন। শিরোনাম ছিল: ‘একজন মৃত মুক্তিযোদ্ধার সম্মানের পাহারাদার এক কিশোর’। দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ওপর মহল থেকে চাপ আসে। অবশেষে ২০২৬ সালের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলে আরিয়ানের ইমেইলে সেই কাঙ্ক্ষিত চিঠি আসে। সরকারি গেজেটে আহমেদকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরিয়ান সেই চিঠি প্রিন্ট করে নিয়ে কবরের পাশে গিয়ে একা একা অনেকক্ষণ কাঁদে।
পুরো শহরে উৎসবের আমেজ। আরিয়ান এবং সালাম স্যারকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সরকারি স্বীকৃতিপত্রটি নিজ হাতে গ্রহণ করার জন্য। আরিয়ান তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটি পরে তৈরি হয়। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত দীপ্তি। আরিয়ান স্বীকৃতিপত্র পাওয়ার পর বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হলো সালাম স্যার গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আরিয়ানের কোলে সেই ফাইল, যাতে আছে গেজেটের কপি এবং স্বীকৃতিপত্র।
আরিয়ান বলছিল, “স্যার, আজ যদি দাদা বেঁচে থাকতেন!” ঠিক তখনই হাইওয়ের একটি মোড়ে একটি দ্রুতগামী ট্রাক ব্রেক ফেল করে তাদের গাড়ির ওপর আছড়ে পড়ে। প্রচণ্ড শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। আরিয়ানের শরীরটা গাড়ির ধাতব ফ্রেমের মাঝে পিষ্ট হয়ে যায়। সালাম স্যার গুরুতর আহত হয়েও আরিয়ানকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। আরিয়ানের নিথর হতে থাকা হাতের মুঠোয় তখনও শক্ত করে ধরা ছিল সেই গেজেটের কপিটি। রক্তে ভিজে একাকার হয়ে গেছে সেই রাষ্ট্রীয় দলিল। অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই আরিয়ানের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। সে যেন দূরে দেখতে পাচ্ছিল, সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে তার দাদামশাই হাত নেড়ে তাকে ডাকছেন।
হাসপাতালে আরিয়ানের বাবা-মা যখন পৌঁছান, তখন করিডোরে শুধু স্তব্ধতা। ডাক্তার মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসেন। আরিয়ানের মা চিৎকার করে জ্ঞান হারান। পরদিন সকালে পুরো শহর স্তব্ধ হয়ে যায়। একদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধা আহমেদের কবরে তোপধ্বনি দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে তাঁর কবর ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। আর ঠিক তার পাশেই খনন করা হচ্ছে আরেকটি ছোট কবর।
আরিয়ানকে দাফন করা হয় তার সেই প্রিয় দাদার ঠিক পাশেই। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ ভেঙে পড়ে। সালাম স্যার হুইলচেয়ারে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন। তিনি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “আহমেদ ছিলেন যুদ্ধের ময়দানের যোদ্ধা, আর আরিয়ান ছিল এই আধুনিক সময়ে কৃতজ্ঞতার ময়দানের যোদ্ধা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। দুটি কবরের ওপরই শিউলি ফুল পড়ে আছে। মানুষ হয়তো আহমেদকে মনে রাখবে, তাঁর বীরত্বের কথা পাঠ্যবইয়ে উঠবে। কিন্তু যে কিশোরটি নিজের জীবনের বিনিময়ে এই গৌরব উদ্ধার করল, সে হয়তো মহাকালের ইতিহাসে স্রেফ একটি সংখ্যা হয়ে হারিয়ে যাবে। বাতাসের শব্দে যেন আজো শোনা যায়— একজনের রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, আর অন্যজনের রক্তে সেই স্বাধীনতা তার মর্যাদা খুঁজে পেয়েছিল।
দেখা যায়, কয়েক বছর পর স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা সেই জোড়া কবরের সামনে এসে দাঁড়ায়। নামফলকে আহমেদ হোসেনের নাম জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু আরিয়ানের কবরে কোনো বড় নামফলক নেই। লোকে আহমেদকে চেনে, কিন্তু সালাম স্যার জানেন—এই ইতিহাসের আসল কারিগর ছিল ওই ছোট্ট ছেলেটি। এক মুক্তিযোদ্ধা আর এক সম্মানদাতা আজ পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে, চিরন্তন প্রশান্তিতে।
অসমাপ্ত গল্প