সবার কথা বলে

বৃষ্টিভেজা ঢাকার ফুটপাতে এক অদেখা জীবনের গল্প

0 10

বৃষ্টিভেজা ঢাকার ফুটপাতে এক অদেখা জীবনের গল্প: 
উন্নয়নের মহানগরে স্ট্রিট ফ্যামিলি।

গত সপ্তাহের টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে রাজধানী ঢাকা যেন এক জলমগ্ন নগরীতে পরিণত হয়েছিল। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট, কর্মব্যস্ত মানুষের দুর্ভোগ এবং নগরজীবনের স্থবিরতা ছিল সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এই বৃষ্টির আড়ালে ছিল আরেকটি ঢাকা যে ঢাকার গল্প খুব কমই শিরোনামে আসে। সেই ঢাকা হলো ফুটপাতে বসবাসকারী স্ট্রিট ফ্যামিলির ঢাকা, যাদের প্রতিটি বর্ষার দিনই পরিণত হয় টিকে থাকার নির্মম সংগ্রামে।

আরামবাগ এলাকার একটি ছেঁড়া ত্রিপলের নিচে গাদাগাদি করে বসেছিল পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার। সারারাতের প্রবল বর্ষণে তাদের বিছানা, কাপড়, খাবারসবকিছু ভিজে গেছে। দুই বছরের শিশুটি ঠান্ডায় কাঁপছে, আর তার মা ভেজা কাপড়েই তাকে জড়িয়ে উষ্ণ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। একটু দূরে এক বৃদ্ধ বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া রিকশার সিট শুকানোর চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে কমলাপুর রেলস্টেশনের কয়েকজন কিশোর, যারা প্রতিদিন প্লাস্টিক ও বর্জ্য সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে, সারা দিনের কাজ হারিয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

একজন পথবাসী মায়ের কণ্ঠে ধরা পড়ে নগরের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা। তিনি বলেন, “মানুষ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ঘরে যায়। আমাদের তো ঘরই নেই। বৃষ্টি থামলে আবার সেই ফুটপাতেই ফিরে যেতে হয়।”

একই শহর, দুই বাস্তবতা:

ঢাকা আজ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বিকাশমান মহানগরগুলোর অন্যতম। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বহুতল ভবন, আধুনিক হাসপাতাল, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন দেশের অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কিন্তু একই শহরে হাজারো পরিবার দিনের শেষে আশ্রয় নেয় ফুটপাতে, উড়ালসেতুর নিচে, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, বাস টার্মিনালে কিংবা বাজারের বারান্দায়। উন্নয়নের এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও তুলে ধরে।

স্ট্রিট ফ্যামিলি কারা?

স্ট্রিট ফ্যামিলি বলতে এমন পরিবারকে বোঝায়, যাদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান নেই এবং যাদের জীবন ও জীবিকা মূলত রাস্তা, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল বা উন্মুক্ত জনপরিসরকে ঘিরে আবর্তিত হয়।

তাদের অধিকাংশই এসেছেন নদীভাঙন কবলিত এলাকা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত অঞ্চল কিংবা চরম দারিদ্র্যপীড়িত জনপদ থেকে। কেউ পারিবারিক সহিংসতার শিকার, কেউ কর্মসংস্থানের আশায় রাজধানীতে এসে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকেই দিনমজুর, রিকশাচালক, ভাসমান শ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী কিংবা ক্ষুদ্র অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত। কিন্তু অনিয়মিত আয় এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে একটি ভাড়া বাসাও তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

অদৃশ্য এক জনগোষ্ঠী:

স্ট্রিট ফ্যামিলির সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তারা নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করে এবং জাতীয় জরিপ বা আদমশুমারির আওতায় অনেকেই অন্তর্ভুক্ত হন না।

বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে লাখ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের “স্ট্রিট সিচুয়েশন”-এ বসবাস বা কাজ করে, যার একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছে। একই সঙ্গে নগর দরিদ্র ও পথবাসী পরিবারের সংখ্যাও প্রতি বছর বাড়ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন এই সংকটকে আরও গভীর করছে।

বৃষ্টি মানেই ক্ষুধা:

একজন চাকরিজীবীর কাছে বৃষ্টি মানে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হওয়া। একজন ব্যবসায়ীর কাছে বৃষ্টি মানে বিক্রি কমে যাওয়া। কিন্তু একজন স্ট্রিট ফ্যামিলির কাছে বৃষ্টি মানেই

সেদিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া,
পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে না পারা,
ভেজা কাপড়ে রাত কাটানো,
শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়া,
এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়ানো।

ফুল বিক্রি করা শিশু, বর্জ্য সংগ্রহকারী কিশোর, দিনমজুর, ভিক্ষাবৃত্তিতে নির্ভরশীল বৃদ্ধ—সবার কাছেই বর্ষার প্রতিটি দিন ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ের প্রতীক।

জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব শিকার:

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে গ্রামাঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীমুখী হচ্ছেন।

কিন্তু ঢাকায় এসে অনেকেই স্থায়ী কাজ কিংবা নিরাপদ বাসস্থান পান না। ধীরে ধীরে তারা ফুটপাত, স্টেশন কিংবা উন্মুক্ত স্থানে বসবাসে বাধ্য হন। অর্থাৎ ঢাকার বহু স্ট্রিট ফ্যামিলি প্রকৃত অর্থেই জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার, যাদের দুর্দশা কেবল দারিদ্র্যের নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটেরও নির্মম পরিণতি।

সমাধান কী?

স্ট্রিট ফ্যামিলির সমস্যা কোনো একক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সরকার, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ।

জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা, শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

মানবিক উন্নয়নের প্রশ্ন:

একটি শহরের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন, মেট্রোরেল কিংবা প্রশস্ত সড়ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও অনুভব করতে পারে।

ঢাকার ফুটপাতে বসবাসকারী একটি শিশুর নিরাপদ ঘুম, একটি মায়ের নিশ্চিন্ত রাত এবং একটি পরিবারের মাথা গোঁজার আশ্রয় নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়নের গল্প অপূর্ণই থেকে যাবে।

বর্ষার জল একদিন শুকিয়ে যাবে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামও বদলে যাবে। কিন্তু ফুটপাতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলতেই থাকবে। তাই এখনই সময় এই অদেখা মানুষগুলোর দিকে রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার দৃষ্টি ফেরানোর। কারণ উন্নয়নের সত্যিকারের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের মধ্য দিয়েই।

আজিজুর রহমান
উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.