
অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি ঠেকাতে ‘ক্রিসমাস ট্রি’ কাটার অভিযোগ
ডেস্ক রিপোর্টঃ
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদে পাঁচ কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ জন্য ২৬ জন ডিআইজির বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) ও চাকরিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হচ্ছে। তবে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে জোরালো তদবির, পালটাপালটি অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় তিন দশক আগের একটি গাছ কাটার ঘটনাকে সামনে এনে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন দায় চাপানো হচ্ছে, যার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পদোন্নতির বিবেচনায় থাকা ২৬ জন ডিআইজির মধ্যে ৯ জন বিসিএস ১৫ ব্যাচ এবং ১৭ জন বিসিএস ১৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা অনেক কর্মকর্তার জন্য অতিরিক্ত আইজিপি পদে উন্নীত হওয়াই সর্বোচ্চ পদোন্নতির সুযোগ হতে পারে। তবে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে নানা অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব কর্মকর্তার অনেককে বিএনপিপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করে একাধিকবার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এখন আবার তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা লাগিয়ে পদোন্নতির পথ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন দশক আগের গাছ কাটার ঘটনা
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পুলিশ সদর দপ্তরের মূল ভবনের সামনে একটি ‘ক্রিসমাস ট্রি’ রোপণ করেন। সে সময় তার সঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে পুলিশ সদর দপ্তরের সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের অংশ হিসেবে গাছটি কেটে সেখানে একটি পানির ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়। তখন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. মোখলেসুর রহমান। বর্তমানে ওই ঘটনাকে সামনে এনে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গাছ কাটার দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তারা ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সে সময় পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত কয়েকজন মালী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাতের বেলায় গাছটি কেটে ফেলা হয় এবং ঘটনাস্থলে কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। পরে তারা জানতে পারেন, তৎকালীন আইজিপির নির্দেশে গাছটি অপসারণ করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে নতুন বিতর্ক
ভুক্তভোগী কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তারা চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ এখন তাদেরই আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক পেশাদার কর্মকর্তা পদোন্নতির সুযোগ পাননি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই বঞ্চনার অবসান ঘটার প্রত্যাশা থাকলেও এখন নতুন করে রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করে পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, তৎকালীন আইজিপি পর্যায়ে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের দায় নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের ওপর চাপানোর যৌক্তিকতা নেই। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে দেওয়ার প্রবণতা মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হয়। এর আগে পুলিশ বাহিনীতে এমন সংস্কৃতি ছিল না। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে অনেক জুনিয়র কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে কঠোরভাবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন। কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে সরকার তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। তবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাউকে হয়রানি বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হলে পুলিশ প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পাঁচ পদ ঘিরে জোরালো প্রতিযোগিতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত আইজিপির মাত্র পাঁচটি শূন্য পদকে ঘিরে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন, আবার কেউ নিজের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলছেন।
একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। পদোন্নতির সম্ভাবনা কম দেখে কিছু কর্মকর্তা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তাদের পদোন্নতি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ওপরও পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সূত্রঃ যুগান্তর