
ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে কার সম্ভাবনা বেশি?
ডেস্ক রিপোর্টঃ
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এবারের ব্যালন ডি’অর কার হাতে উঠবে? ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, গোল-অ্যাসিস্ট, দলীয় সাফল্য এবং বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স বিবেচনায় হ্যারি কেন, লামিন ইয়ামাল, রদ্রি, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি রয়েছেন আলোচনার শীর্ষে।
হ্যারি কেন :
ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৪ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন হ্যারি কেন। ২০১১-১২ মৌসুমে লিওনেল মেসির ৮২ গোলের পর এক মৌসুমে এটি কোনো খেলোয়াড়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা। ক্যারিয়ারের শুরুতে চ্যাম্পিয়নশিপে জেমি ভার্ডির সঙ্গে বেঞ্চে বসে থাকা কেন কখনো কিশোর বয়সে বিস্ময়বালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। তবে ৩৩ বছর বয়সে এসে তিনি নিজেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
গত ১২ মৌসুমে প্রতিবারই কমপক্ষে ২৪ গোল করেছেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে টানা দুটি গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট এবং দুটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতলেও ব্যালন ডি’অর ভোটে কখনো দশম স্থানের ওপরে উঠতে পারেননি।
তবে এবার গোলের পাশাপাশি দলীয় শিরোপাও রয়েছে তার ঝুলিতে। গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগা জিতে দীর্ঘদিনের ট্রফিখরা কাটান তিনি। চলতি মৌসুমে বুন্দেসলিগার পাশাপাশি ডিএফবি-পোকাল ও জার্মান সুপারকাপও জিতেছেন।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড শিরোপা না পেলেও অধিনায়ক কেন করেছেন ছয় গোল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। সব মিলিয়ে ব্যালন ডি’অর দৌড়ে কেন এখনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী।
লামিন ইয়ামাল :
ফেব্রুয়ারিতে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে বার্সেলোনার ৪-১ গোলের জয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকের পর ইয়ামাল বলেছিলেন, বক্সে বল তার পায়ে থাকলে কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত তিনিই নেন। অন্য কোনো ১৯ বছর বয়সীর মুখে এমন কথা আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু মনে হতে পারত। তবে ইয়ামাল নিজেকে ইতোমধ্যেই ব্যতিক্রমী প্রতিভা হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলে দুটিতেই শিরোপা জেতা প্রথম ফুটবলার তিনি। বিশ্বকাপে মাত্র একবার গোল পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে তার প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ একটি পেনাল্টি আদায় করেন ইয়ামাল। পুরো টুর্নামেন্টে মেসির চেয়েও বেশি সফল ড্রিবল করেন তিনি। ফাইনালে আর্জেন্টিনার শক্ত রক্ষণ ভাঙতেও রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়েও এমন পারফরম্যান্স তার সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।
বার্সেলোনার হয়ে ৪৫ ম্যাচে ২৪ গোল ও ১৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন ইয়ামাল। তার দল জিতেছে লা লিগা ও সুপারকোপা। গতবার ব্যালন ডি’অরে রানার্সআপ হওয়া এই তরুণ এবার শিরোপা জয়ের অন্যতম বড় দাবিদার।
রদ্রি :
দীর্ঘদিনের এসিএল চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর গত অক্টোবরে ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, বিশ্বকাপেই দেখা যাবে আসল রদ্রিকে। চোটের পর তিনি আগের ছন্দে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তবে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে সেই সংশয় দূর করেছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
স্পেন দলের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রক ও রক্ষণভাগের প্রধান ভরসা ছিলেন রদ্রি। বলের দখল, খেলার গতি এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ—সবকিছুই দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৭৫৬টি সফল পাস করেছেন রদ্রি। টাচ, প্রতিপক্ষের রক্ষণভেদী পাস এবং প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে সফল পাসের ক্ষেত্রেও ছিলেন সবার ওপরে। ফাইনালে একাই ১০১টি পাস সম্পন্ন করেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে কোনো শট নিতে পারেনি।
স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বলও পেয়েছেন রদ্রি। বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, ইউরোপিয়ান কাপ ও ব্যালন ডি’অর জেতা ইতিহাসের চতুর্থ ফুটবলারও তিনি। এর আগে গার্ড মুলার, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও জিনেদিন জিদান এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে :
বিশ্বকাপে সাবেক পিএসজি সতীর্থ লিওনেল মেসির সঙ্গে একাধিক অর্জনের লড়াইয়ে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ট্রফি, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন দুজন। এর মধ্যে দুটি অর্জন নিজের করে নিয়েছেন এমবাপ্পে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জেতেন তিনি। বিশ্বকাপে তার মোট গোল দাঁড়ায় ২২টি, যা মেসির চেয়ে একটি বেশি। ১৯৭০ সালের পর একই বিশ্বকাপে দুই অঙ্কের গোল করা প্রথম ফুটবলারও তিনি।
তবে ব্যক্তিগত সাফল্য তাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফ্রান্সের অধিনায়ক বলেন, শীর্ষ গোলদাতা হওয়ার চেয়ে তিনি ফাইনালে খেলতে বেশি পছন্দ করতেন।
ক্লাব ফুটবলেও গোলের দিক থেকে দারুণ মৌসুম কাটিয়েছেন এমবাপ্পে। ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করার পাশাপাশি লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। কিন্তু কোনো শিরোপা জিততে না পারায় তার ব্যালন ডি’অর সম্ভাবনা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
লিওনেল মেসি :
বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর ৮০ হাজার দর্শকের স্টেডিয়ামে একা বসে ছিলেন লিওনেল মেসি। পায়ে জুতা ছিল না, আর তার পাশ দিয়ে উদযাপন করতে করতে যাচ্ছিলেন স্পেনের বদলি খেলোয়াড়রা। বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায়ের যে রূপকথার সমাপ্তি তিনি হয়তো কল্পনা করেছিলেন, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ৪০ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ হয়তো কেবল স্মৃতিচারণের উপলক্ষ হবে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে সবাইকে চমকে দেন তিনি। পরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে আরও একটি গোল করেন।
গ্রুপ পর্ব থেকেই টুর্নামেন্টে নিজের প্রভাব দেখান মেসি। নকআউট পর্বে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল, মিসরের বিপক্ষে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আরও দুটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এমবাপ্পে জোড়া গোল না করলে গোল্ডেন বুটও মেসির হাতে উঠতে পারত। তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে ব্যালন ডি’অর জেতা তার জন্য কঠিন হতে পারে।
গত ১৯ বছরে মাত্র চারবার এমন ঘটেছে, যখন একই বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ কিংবা কোপা আমেরিকা না জিতেও কোনো ফুটবলার ব্যালন ডি’অর পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনবারই পুরস্কারটি জিতেছেন মেসি।
৩৯ বছর বয়সে এমএলএসে খেলে বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরেও ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় থাকা মেসির অসাধারণ ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। নবমবারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জেতা কঠিন হলেও তাকে এখনো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সূত্রঃ বাসস