সবার কথা বলে

ঢাকায় ধারাবাহিক বোমা আতঙ্ক: নেপথ্যে কারা, খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

0 8

ঢাকায় ধারাবাহিক বোমা আতঙ্ক: নেপথ্যে কারা, খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ডেস্ক রিপোর্টঃ

রাজধানীর মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এবং সাভারের আশুলিয়ায় কয়েক দিনের ব্যবধানে বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল ও আশুলিয়ায় পাওয়া দুটি বস্তু প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক বস্তুতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।

একাধিক ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি কোনো গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে জনমনে ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো জরুরি বার্তায় এ সতর্কতা জারি করা হয়।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। তবে সিটিটিসিসহ পুলিশের কয়েকটি দল ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করছে। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারের পর তাদের উদ্দেশ্য, ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে এবং কী কারণে এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছে—এসব বিষয় পরিষ্কার হবে। যেকোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। উগ্রবাদী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের ধারণা, কোনো দুষ্কৃতকারী চক্র ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে প্রায় ১ থেকে দেড় কেজি ওজনের শক্তিশালী পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন।

এর ছয় দিন পর ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকান থেকে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে রাখা প্রেসার কুকার দিয়ে তৈরি একটি আইইডি উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরকটিতে টাইমার যুক্ত ছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছিল। দুটি ঘটনাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর মধ্যে শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সন্দেহজনক বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে বোম ডিসপোজাল ইউনিট পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল পান-সুপারি রাখার একটি কৌটা। অন্যদিকে ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার ভেতরে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা।

পরে সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক জানান, মিরপুর ও ফার্মগেটে পাওয়া বস্তু দুটি জননিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করেনি। তবে মতিঝিল ও আশুলিয়ায় প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির গঠনপ্রণালি, ব্যবহৃত বিস্ফোরক উপাদান, টাইমার এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং সন্দেহভাজনদের সম্ভাব্য গতিবিধিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে, গ্রেফতারদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে, সম্প্রতি পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে এসব নেটওয়ার্ক সদস্য সংগ্রহ ও উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকাশ্য সংগঠনের পাশাপাশি ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্ক বা ‘স্লিপার সেল’ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আগের তুলনায় জঙ্গিবাদ এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বড় ধরনের হামলা না হওয়াকে জঙ্গিবাদের অবসান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ছোট ছোট নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার প্রবণতা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তার মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। উগ্রবাদ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বড় ধরনের হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের সন্দেহজনক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, কোনো নাম বা আদর্শের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালিত হলেও তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার পর্যবেক্ষণ সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুজব ও জনআতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোর দ্রুত ও গভীর তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। তাদের মতে, দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ আরও কার্যকর হবে।

সারা দেশে পুলিশের বিশেষ সতর্কতা

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপ, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে হামলার চেষ্টা করতে পারে। এমন আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা শিথিলতা গ্রহণযোগ্য হবে না। ডিউটির সময় এবং দায়িত্ব শেষে পার্ক করা গাড়িগুলোর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো পুলিশি যানবাহন সাময়িকভাবে থামাতে হলে তা নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া কোনো গাড়ি ফেলে রাখা যাবে না।

ডিউটি শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ড বা নির্ধারিত স্থানে রাখা সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তাও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় নিয়মিত টহল, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সূত্রঃ যুগান্তর 

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.