
কাস্পিয়ান হামলার পর নতুন প্রশ্ন, ইউক্রেন-ইরান সংঘাতের আশঙ্কা কি বাড়ছে?
ডেস্ক রিপোর্টঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আপাতত একে অপরের ওপর সরাসরি হামলা স্থগিত রাখলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের ধারণা, সংঘাত ভিন্ন মাত্রা নিতে পারে এবং নতুন এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার পর বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ২৫ জুলাইয়ের ওই হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র বা ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ হিসেবে ইউক্রেন সামনে আসছে কি না।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের দ্বিতীয় ধাপে দুই পক্ষ একাধিকবার পালটা হামলা চালিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বড় পরিসরের প্রচলিত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। কৌশলগত অস্ত্রের মজুদ কমে আসা এবং যুদ্ধের বাড়তি খরচ ওয়াশিংটনকে সাময়িকভাবে সংঘাত থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে কোনো স্থলসীমান্ত না থাকলেও এ হামলা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে নতুন ধরনের যোগসূত্র তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে তাদের মত।
হামলার ঘটনায় ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং ইউক্রেনকে পালটা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইউক্রেনের দিক থেকে ইরানের ওপর আরও হামলা হলে তেহরানকে উত্তরাঞ্চলেও সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, ড্রোন এবং গোয়েন্দা সক্ষমতার একটি অংশ নতুন ফ্রন্টে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এর ফলে অন্য অঞ্চলে ইরানের সামরিক শক্তি কিছুটা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য এটি কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য ইউক্রেনকে ব্যবহার করে ইরানকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়; বরং তেহরানকে একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখা, যাতে তারা কোনো একটি অঞ্চলে পুরো সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে না পারে।
কাস্পিয়ান সাগরে হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়তে দেখা যায়। একই দিনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পৃথকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনায় ইরানের ওপর কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এর আগে ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি ম্যাথিউ হুইটেকারের সঙ্গে বৈঠকে জেলেনস্কি ইউক্রেনে লাইসেন্সের মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেনের ড্রোন সহযোগিতা নিয়ে কথা বলেন। পরে একই বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ শুধু ইউক্রেনকে বাড়তি আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উৎপাদন কাঠামোর অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় উন্নত হওয়া ইউক্রেনের ড্রোন প্রযুক্তিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টাও চলছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ইউক্রেন দূরপাল্লার ড্রোন হামলা, নাশকতামূলক অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ‘অপারেশন স্পাইডার ওয়েব’-এর মতো অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেন দেখিয়েছে, তারা হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালাতে পারে।
এ কারণে ভবিষ্যতে ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে তা প্রচলিত ট্যাংকনির্ভর বা স্থলযুদ্ধের রূপ নাও নিতে পারে। বরং দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গোপন সামরিক অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা সংঘাতের প্রধান কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এমন পরিস্থিতি নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ইরান সংঘাত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এতে কৃষ্ণসাগর, ককেশাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চলজুড়ে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব তুরস্কসহ পুরো অঞ্চলে পড়তে পারে।
সূত্রঃ যুগান্তর