সবার কথা বলে

বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে আর্থিক বোঝা, কয়লাকেন্দ্রের বকেয়া ৪৬৫১ কোটি টাকা

0 4

বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে আর্থিক বোঝা, কয়লাকেন্দ্রের বকেয়া ৪৬৫১ কোটি টাকা

ডেস্ক রিপোর্টঃ

দেশে একদিকে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আর্থিক দায়ও ক্রমেই বড় হচ্ছে। মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ ঘাটতি ও বকেয়া পরিশোধে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়ার পরিমাণই প্রায় ৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা, কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি সামলাতে দ্রুত বকেয়া অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ বিষয়ে অর্থ সচিবকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করলেই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎ ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় এবং গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। তা না হলে একটি কেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধের পর অন্য কেন্দ্রেও নতুন করে ট্যারিফ ঘাটতি তৈরি হবে। এতে প্রতিবছর সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নথি অনুযায়ী, আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট পটুয়াখালী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের ২৮ মে থেকে। একইভাবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিপিজিসিবিএল) ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর থেকেই ট্যারিফ ঘাটতির হিসাব করা হচ্ছে।

কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে গেলেও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকদের কাছে কম দামে বিক্রি করে। ফলে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য মেটাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে আরএনপিএল ও সিপিজিসিবিএলের ইউনিটভিত্তিক বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রভিশনাল ট্যারিফ এবং ক্যাপাসিটি ও এনার্জি পেমেন্টের হিসাব করে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট প্রকল্পটির অর্থায়নেও সরকারের ওপর বড় ধরনের দায় রয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন ঋণ সিন্ডিকেট থেকে প্রকল্পটির জন্য অর্থ নেওয়া হয়েছে। এর ৫০ শতাংশ ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে। ঋণের প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধ করা হলেও পরবর্তী কিস্তি হিসেবে ১৩৬ দশমিক ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের দায় সামনে এসেছে।

অর্থাৎ, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ব্যয়ের পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তিও সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে দেরি হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা এবং জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ অবশ্য নতুন নয়। পিডিবির হিসাবে, চলতি বছর এই খাতে ভর্তুকির চাহিদা ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে পিডিবি জানিয়েছিল, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহে গড়ে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ টাকা ৯৭ পয়সা। বিপরীতে বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭ টাকা। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এ আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা পরিশোধের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি নতুন আর্থিক দায়ও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তবে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার অতিরিক্ত ব্যয় কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো হবে না বলে তিনি জানান।

বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, বিশেষ আইন বাতিল হলেও ওই আইনের আওতায় আগে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল থাকবে। এসব চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হলেও বাস্তবে জ্বালানি ও গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে সব সক্ষমতা সব সময় ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের দায় সরকারের ওপর থেকেই যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আরএনপিএলের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও জ্বালানি সরবরাহে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বকেয়া ভর্তুকির অর্থ দ্রুত পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

সূত্রঃ যুগান্তর 

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.