
মার্কিন এআই মডেলের সহায়তায় সামরিক প্রযুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে
ডেস্ক রিপোর্টঃ
মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের উন্নত মডেল থেকে পাওয়া তথ্য ও আউটপুট কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট নিজস্ব এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছেন চীনের সামরিক গবেষকেরা। চীনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৮০টির বেশি গবেষণাপত্র ও পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সামরিক ও নিরাপত্তা খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ‘মডেল ডিস্টিলেশন’ নামে পরিচিত একটি কৌশল ব্যবহার করছে। এ পদ্ধতিতে শক্তিশালী ও বড় এআই মডেলের তৈরি করা উত্তর বা আউটপুট ব্যবহার করে তুলনামূলক ছোট এবং নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং অবকাঠামো ছাড়াই স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর এআই ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সংগৃহীত তথ্য এবং রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ও সামরিক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্রিয়। গবেষণাপত্রগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই প্রযুক্তির ব্যবধান কমাতে পশ্চিমা মডেলগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে চীনের প্রতিরক্ষা খাত।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু শুধু ডিস্টিলেশন প্রযুক্তি নয়। অনুমতি ছাড়া বিদেশি এআই মডেল থেকে সক্ষমতা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান ডিস্টিলেশন পদ্ধতির মাধ্যমে মার্কিন এআই মডেলের কিছু সক্ষমতা নিজেদের প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। এতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, এআই খাতে নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এমন অভিযোগ তুলছে। একই সঙ্গে চীনের দাবি, অতীতে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের নজির রয়েছে।
জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের গবেষক সানি চিয়াং জানান, পশ্চিমা এআই মডেল কীভাবে যুক্তি বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সেই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক সংগ্রহ করে চীনা সামরিক গবেষকেরা ছোট ও বিশেষায়িত মডেল তৈরির চেষ্টা করছেন। এসব মডেল ভবিষ্যতে নজরদারি, সাইবার যুদ্ধ এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে ব্যবহার করা হতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বেইজিংভিত্তিক পিএলএ ইউনিট ৯৬৯৪১-এর গবেষকেরা সংবেদনশীল সামরিক সফটওয়্যার কোড বিশ্লেষণে ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৩.৫ ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা মূল কোড বিদেশি এআই মডেলে না দিয়ে প্রথমে জিপিটি-৩.৫-এর মাধ্যমে কোডের সারসংক্ষেপ তৈরি করেন। পরে সেই সারসংক্ষেপ কাজে লাগিয়ে একটি দেশীয় এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা চীনের সামরিক নেটওয়ার্কের মধ্যেই পরিচালনা করা সম্ভব।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পিপলস লিবারেশন আর্মি এবং ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও রয়টার্সের অনুরোধে কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনের নর্থ ইউনিভার্সিটি অব চায়নার গবেষকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন কনটেন্ট শ্রেণিবিন্যাসের জন্য অ্যানথ্রোপিকের ক্লড ৩ হাইকু মডেল ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রশিক্ষণ ডেটা তৈরি করেছেন। তবে অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, তারা চীনে বা বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্লডের বাণিজ্যিক ব্যবহারাধিকার দেয় না। নীতিমালা এড়িয়ে ব্যবহারের চেষ্টা শনাক্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও চালু রেখেছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পিএলএর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজি ডিস্টিলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ড্রোনে চালানো সম্ভব এমন হালকা ইমেজ প্রসেসিং মডেল তৈরির কথা জানায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোন নিজেই ভিডিও বিশ্লেষণ করে চলাচলের পথ নির্ধারণ এবং লক্ষ্য শনাক্তে সহায়তা নিতে পারে।
একই ধরনের গবেষণায় চীনের একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেসের গবেষকেরা ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও চালকবিহীন সাবমেরিন নিয়ে পরিচালিত সামরিক মহড়ায় লক্ষ্য শনাক্তকরণের কাজে ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে তৈরি এআই মডেল ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরেছেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উন্নত চিপ রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধের কারণে সীমিত কম্পিউটিং সক্ষমতা নিয়েও এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চীন ডিস্টিলেশন প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ডিস্টিলড মডেল বড় মডেলের নির্দিষ্ট কিছু দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারলেও উন্নত এআইয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা বা পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিমত্তা পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।
এআই ডেটা প্রতিষ্ঠান স্যাপিয়েনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ট্রেভর কোভারকোর মতে, ডিস্টিলেশন হলো কম খরচে কোনো নির্দিষ্ট এআই সক্ষমতাকে স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার একটি পদ্ধতি। এটি বড় ও উন্নত এআই মডেলের সম্পূর্ণ বিকল্প নয় এবং এ প্রযুক্তিতে পূর্ণ স্বনির্ভরতাও নিশ্চিত হয় না।
সূত্রঃ যুগান্তর