সবার কথা বলে

৩৬ জুলাই সংখ্যার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

0 1

৩৬ জুলাই সংখ্যার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

যখন সহিংসতার মাঝে পথশিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল মানবতা,  ইতিহাসে কিছু দিন থাকে, যা শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির বিবেককে আজীবন প্রশ্ন করে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সহিংসতা তেমনই এক সময়। রাজপথে সংঘাত, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সবচেয়ে অসহায় ছিল শিশুরা। তারা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের ছিল না; তারা ছিল কেবল শিশু—যাদের স্বপ্ন ছিল স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করা, বড় হয়ে মানুষ হওয়া।

কিন্তু সেই স্বপ্নের অনেকগুলোই থেমে যায়। কেউ আর ঘরে ফেরেনি, কেউ চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে, আবার অনেকেই এমন মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে, যা হয়তো সারাজীবন বহন করতে হবে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF জানায়, জুলাই ২০২৪-এর সহিংসতায় অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত হয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR)-এর ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন, যার ১২–১৩ শতাংশই শিশু। অর্থাৎ আনুমানিক ১৬৮ থেকে ১৮২ জন শিশু এই সহিংসতার শিকার হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ১১,৭০০-এরও বেশি মানুষকে আটক করার তথ্যও উঠে এসেছে।
তবে এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি অসমাপ্ত শৈশব এবং একটি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

যাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় ছিল না, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছিল ঢাকা শহরের পথশিশু ও স্ট্রিট ফ্যামিলিগুলো। তাদের জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করার সুযোগ ছিল না, কারণ তাদের অনেকেরই কোনো ঘর নেই। ফুটপাত, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল, বাজার কিংবা উড়ালসেতুর নিচেই তাদের বসবাস।

সহিংসতার সময় স্বাভাবিক জীবন থেমে যায়। খাবার সংগ্রহ, ছোটখাটো কাজ, বর্জ্য সংগ্রহ কিংবা মানুষের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই শিশুদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই দিনের পর দিন না খেয়ে বা অর্ধাহারে কাটায়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা পরিচিত আশ্রয়স্থলও ছেড়ে পালিয়ে বেড়ায়।
শুধু ক্ষুধা নয়, তাদের মনে জমে ওঠে গভীর ভয়। বিস্ফোরণের শব্দ, গুলির আওয়াজ, মানুষের ছুটোছুটিসবকিছু তাদের শৈশবের স্মৃতিকে আতঙ্কে ভরে দেয়। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদে ট্রমা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

সংকটের সময় মানবতার হাত, এই কঠিন সময়ে কিছু মানবিক উদ্যোগ অসংখ্য শিশুর জন্য আশার আলো হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে পথশিশু ও স্ট্রিট ফ্যামিলির সঙ্গে কাজ করা Local Education and Economic Development Organization (LEEDO) জরুরি মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। সহিংসতার সময় শত শত পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে তাদের বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রে (Traditional Shelter Homes) নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা হয়।

শুধু আশ্রয় নয়, যখন শহরের বহু শিশুর কাছে একবেলা খাবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন LEEDO প্রায় ৫,০০০ জন পথশিশু ও স্ট্রিট-সংযুক্ত শিশুর মধ্যে রান্না করা খাবার (cooked food) বিতরণ করে। এই উদ্যোগ ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য শুধু খাদ্য নয়, নিরাপত্তা ও মানবিক সহমর্মিতারও প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয় যে, দুর্যোগ বা সহিংসতার সময় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনগুলোর দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সংখ্যার আড়ালে যে গল্প প্রথমে বলা হয়েছিল অন্তত ৩২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। পরে জাতিসংঘের তদন্তে উঠে আসে আরও বড় বাস্তবতা—নিহতদের উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল শিশু। প্রায় ১,৪০০ প্রাণহানির মধ্যে ১২–১৩ শতাংশ শিশু, অর্থাৎ আনুমানিক ১৬৮ থেকে ১৮২টি শৈশব আর কখনো বড় হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি।

একই সময়ে ১১,৭০০-এরও বেশি মানুষ আটক হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু একটি প্রশাসনিক তথ্য নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবার, আতঙ্কে কাটানো রাত এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা হাজারো শিশুর গল্প।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC)-এর সদস্য রাষ্ট্র। প্রতিটি শিশুর জীবনের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।

জুলাইয়ের সেই সহিংসতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—সংকটের সময় শিশুদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা, জরুরি আশ্রয়, নিরাপদ খাদ্য, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পথশিশুদের জন্য বিশেষ মানবিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা সম্পূর্ণ হতে পারে না ।

একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধু একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি শিশুর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

আর যখন সংকটের সময় কোনো সংগঠন শত শত শিশুকে আশ্রয় দেয়, হাজারো শিশুর হাতে একবেলা খাবার তুলে দেয়, তখন সেটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে মানবতার ইতিহাস।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার উঁচু ভবনে নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় শিশুটিকে সে কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, সেখানেই।

আজিজুর রহমান
উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.